নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচারের আশা দেখছেন স্বজনেরা। তাঁরা মনে করছেন, অন্তবর্তী সরকারের সদিচ্ছা হলে সাত খুনের ঘটনার বিচারের মত আমাদের বিচার সম্পন্ন হবে। একইভাবে সরকার চাইলে এসব হত্যারও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার সম্ভব।
মামলা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেছে, মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী ও ব্যবসায়ী ভুলু সাহা হত্যা মামলার বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থাগুলো অনেক দিন ধরেই নিষ্ক্রিয়। কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হতে পারে, সে বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারছেন না। অপর তিনটি মামলার মধ্যে সংস্কৃতিকর্মী দিদারুল আলম (চঞ্চল), ব্যবসায়ী আশিক ইসলাম ও ছাত্রলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম (মিঠু) হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও তাতে প্রকৃত আসামিদের নাম আসেনি বলে অভিযোগ বাদীদের। এ জন্য তিন মামলায়ই বাদী আদালতে নারাজি দিয়েছেন। এরপর সেভাবেই পড়ে রয়েছে মামলা তিনটি।
২০১১ সালের ১১ মে শীতলক্ষ্যা নদীতে ব্যবসায়ী আশিক ইসলামের লাশ পাওয়া যায়। তার মুখমণ্ডল ঝলসানো এবং বিশেষ অঙ্গ ছিল থেঁতলানো। আশিকের ভাই ফাহিমুল ইসলাম জানান, তারা থানায় অভিযুক্ত আজমেরী ওসমানের নামে মামলা করতে যান ১৫ মে। ও সময় তৎকালীন ওসি আকতার হোসেন তাদের বলেন, তার বাবা নাসিম ওসমান খুব ভালো। তার ছেলে আজমেরী ওসমানও খুব ভালো। তিনি এসব করতে পারেন না। ফলে আমরা মামলায় আজমেরীর নাম দিতে পারিনি। আজ প্রায় ১৪ বছর হতে যাচ্ছেন বিচার তো দূরের কথা আসামীদের কারাগারে রাখতে পারেনি। হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও তাতে প্রকৃত আসামিদের নাম আসেনি।
২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল গাজীপুরে সাবেক এমপি শামীম ওসমানের শীর্ষ ক্যাডার নুরুল আমিন মাকসুদের লাশ পাওয়া যায়। তাকে আজমেরী ওসমান খুন করেছেন বলে নারায়ণগঞ্জে প্রচার রয়েছে। ২০১১ সালে এপ্রিলে শহরের প্রেসিডেন্ট রোডে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে গলা কেটে খুন করা হয় অটোচালক জামালকে। অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পরিবহনে রাজি না হওয়ায় আজমেরীর বাহিনী তাকে খুন করে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হলেও তাকে মামলায় আসামি করা যায়নি। আশিক হত্যার পর ২০১১ সালের মে মাসের শেষ দিকে শীতলক্ষ্যা নদীতে অজ্ঞাতপরিচয় দুই যুবকের লাশ পাওয়া যায়। সে সময় নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রচার হয়, এই দুটি লাশ আশিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত ভাড়াটে খুনির। হত্যার আলামত মুছে ফেলতে তাদের খুন করা হয়েছে।
সংস্কৃতিকর্মী দিদারুল আলম (চঞ্চল), ব্যবসায়ী আশিক ইসলাম ও ছাত্রলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম (মিঠু) হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও তাতে প্রকৃত আসামিদের নাম আসেনি বলে অভিযোগ বাদীদের। এ জন্য তিন মামলায়ই বাদী আদালতে নারাজি দিয়েছেন। এরপর সেভাবেই পড়ে রয়েছে মামলা তিনটি। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, এই পাঁচ হত্যার সঙ্গেই ওসমান পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের নাম আসায় মামলার তদন্ত ঠিকভাবে হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে তাদের স্বজন হত্যার মামলাগুলো নতুন করে সুষ্ঠু তদন্তের উদ্যোগ চান।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী বলেন, তাঁর ছেলেকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় ওসমান পরিবারের সন্তান আজমেরী ওসমান জড়িত রয়েছেন। ত্বকী হত্যার ঘটনায় তদন্তের পর অনেক আগে র্যাব একটি খসড়া অভিযোগপত্র তৈরি করেছিল, তাতে আজমেরী ওসমানকে প্রধান আসামি বলা হয়েছে।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ ত্বকীকে নারায়ণগঞ্জে নিজ বাসার কাছ থেকে অপহরণ করা হয়। ৮ মার্চ তার লাশ পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যা নদীতে। উচ্চ আদালত র্যাবকে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেন। ২০১৪ সালে ত্বকী হত্যার এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, শিগগিরই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।
ত্বকী হত্যার তদন্তে আজমেরী ওসমান ও তাঁর ১০ সহযোগীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে ২০১৪ সালে র্যাবের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গিয়েছিল। কিন্তু পরে একপর্যায়ে তদন্ত স্থবির হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, আজমেরীর বাবা প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমান। আর তাঁর দুই চাচা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান এখন নারায়ণগঞ্জের দুটি আসনের সাংসদ ছিলেন।
২০১২ সালে ভুলু সাহাকে হত্যা করা হয়। তবে সদর থানার অপর এক কর্মকর্তা জানান, ভুলু হত্যার তদন্তেও তেমন অগ্রগতি নেই। মিঠু হত্যা মামলার বাদী তাঁর বাবা মারা গেছেন। মা-ও মারা গেছেন। ফলে বলা যায়, মামলাটি চালানোর মতো কেউ নেই।
আপনার মতামত লিখুন :