News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

নারায়ণগঞ্জের সেই কিং মেকার বেকায়দায়


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৫, ০৪:০২ পিএম নারায়ণগঞ্জের সেই কিং মেকার বেকায়দায়

গত বছরের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আর এই পতনের মধ্য দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান। তবে তারা আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের অভিভাবক তথা উপদেষ্টা ও কিংমেকার খ্যাত মোহাম্মদ আলী বহাল এখনও তবিয়তেই রয়েছেন। সেই সাথে তিনি পূর্বের মতোই কিংমেকার হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরও কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তিনি তার অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু এবার সেই কিংমেকার খ্যাত মোহাম্মদ আলী গর্তে পড়ে গেছেন। যে গর্ত থেকে উঠে আসা তার জন্য অনেকটা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। সেই সাথে তাকে বয়কট করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ২৪ মার্চ দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেন।

এসময় নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমাদের মাঝে কোনো বিভেদ নেই। এবার ১৪০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। আমারা আশা করবো আগামীতে এই সংখ্যাটা যেন ১৪০ থেকে ২৪০ করা হয়। আর আমাদের কোনো সমস্যা নেই। যে কোনো সমস্যায় আপনারা জেলা প্রশাসকের কাছে আসবেন। উনি অনেক আন্তরিক। এরপর তিনি ‘জয়বাংলা’ বলে বক্তব্য শেষ করেন।

তার এই জয়বাংলার পরপরই নারায়ণগঞ্জে নানা মহলের শুরু হয়েছে আলোচনা সমালোচনা। সেই সাথে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন।

তারই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের তিরস্কারমূল স্লোগান দেয়া হয়।

এসময় রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমেদ, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও নারায়ণগঞ্জ জেলা গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারি তরিকুল সুজন।

পরবর্তীতে তারা সকলেই জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাথে সাক্ষাৎ করেন। আর সেই সাক্ষাতে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করা হয় মোহাম্মদ আলীকে যেন পরবর্তী পোগ্রামে দাওয়াত দেয়া না হয়। সেই সাথে তাদের অনুরোধের প্রক্ষিতে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়েছেন তাকে আর দাওয়াত দেয়া হবে না। আর এরকম পরিস্থিতি তার জন্য বেশ বিপদজনক।

তার আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনেও মোহাম্মদ আলী আলোচনায় ছিলেন। অভিযোগ ছিলো তিনি পরোক্ষভাবে নির্বাচনের কলকাঠি নেড়েছেন।

জনশ্রুতি রয়েছে- সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ, অরাজনৈতিক শ্রমিক সংগঠন, এমন কি এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্লাব, সমিতির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনেও প্রার্থীদের জন্য মোহাম্মদ আলী আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করে থাকেন। তার আশীর্বাদ পেলে যে কোন প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনে জয়ী হওয়া সহজ হয়ে যায়।

এর আগে আশির দশকে ব্যবসায়ী নেতা থেকে এমপি হওয়ার প্রত্যাশায় জাতীয় পার্টির চেয়াম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরে জাতীয় পার্টির নেতা হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। প্রয়াত হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ তৎকালীন সময়ে স্বৈরাচারের খেতাব প্রাপ্ত হয়ে ক্ষমতা হারানোর পর ১৯৯১ সালর ২৭ জানুয়ারী সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ- ৪ আসন (ফতুল্লা- সিদ্ধিরগঞ্জ) থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। সে সময় ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষের মুখে মুখে মোহাম্মদ আলীর ¯েøাগান থাকলেও নির্বাচনে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী বীরমুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম।

আওয়ামীলীগের প্রার্থী ফুটবলার আশরাফ উদ্দীন আহম্মেদ চুন্নুর থেকে কম ভোট পেয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন মোহাম্মদ আলী। পরে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিতে যোগ দেয়ার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন এই নেতা। তৎকালীন সময়ে জেলা বিএনপির সভাপতি রোকন উদ্দীন মোল্লা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক মাজেদুল ইসলামের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কোনঠাসা হয়ে পড়েন জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক ও সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম। উপায় না দেখে শরনাপন্ন হন ভাগিনা মোহাম্মদ আলীর। তৈরী হয়ে যায় বিএনপিতে যোগ দেয়ার রাস্তা।

১৯৯৫ সালে ফতুল্লা ডিআইটি মাঠে বিশাল সমাবেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে এনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারীর বিএনপির এক তরফা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এমপি হন মোহাম্মদ আলী। সংসদের মেয়াদ ১৭ দিনের হলেও সংসদ সদস্যের চিরস্থায়ী খেতাব অর্জন করেন মোহাম্মদ আলী। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে ঋন খেলাপীর দায়ে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও হয়ে ওঠেন স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা।

২০০১ সালে নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে মনোনয়ন পান জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দেয়া সফর আলী ভূইয়া। সে সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর কারিশমায় নির্বাচনের ২৩ দিন আগে মনোনয়ন বাগিয়ে দেন সদ্য বিএনপিতে যোগ দেয়া কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনকে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী বর্তমান সাংসদ একেএম শামীম ওসমানকে পরাজিত করেন গিয়াসউদ্দিন।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে স্থানীয় শিল্পাঞ্চল থেকে আহরনকৃত আয়ের ভাগ বাটোয়ার সংক্রান্ত বিরোধের কারনে সম্পর্ক নষ্ট হয় মোহাম্মদ আলী ও গিয়াসউদ্দিনের। তখন রাজনৈতিক ভাবে নিস্ক্রীয় হয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলী। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি থাকাকালীন ওয়ান ইলেভেন মঈনুদ্দিন ফখরুদ্দীন সরকারের স্বপ্নদ্রষ্টার খেতাবও অর্জন করেছিলেন এই মুরুব্বী নেতা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ- ৪ আসনে কল্যান পার্টির কোষাধ্যক্ষ শিল্পপতি শাহ আলমকে বিএনপির মনোনয়ন এনে দিয়ে আবারও চালকের আসনে বসেন তিনি। নির্বাচনের মাঝ পথে ব্যয় সংক্রান্ত জটিলতায় কিছুটা অভিমানে শাহ আলমের কাছ সরে যান তিনি। নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চিত্রনায়িকা সারাহ্ বেগম কবরীর নিকট পরাজিত হন শাহ আলম। তার পরেই কিং মেকারের খেতাব অর্জন করেন মুরুব্বী নেতা মোহাম্মদ আলী।

সে থেকে আজ পর্যন্ত নেতা বানানোর কারিগর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মোহাম্মদ আলী। আর তাই নারয়াণগঞ্জের রাজনীতিতে সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যোগ্য অভিভাবক হিসেবে ভরসার আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করেছেন মোহাম্মদ আলী। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের মুরুব্বী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের অপকর্মের দায়ভার তার উপড় বর্তালেও মোহাম্মদ আলী বেশ ভালো অবস্থানেই ছিলেন।

কিন্তু এবার মোহাম্মদ আলীর কণ্ঠে জয়বাংলা যেন বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে তাকে। সেই সাথে এই বিপদ কিংমেকারের কারিশমা কতটা কাজে লাগাতে পারেন সেটাই দেখার বিষয়।

Islam's Group