নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ টিপুতেই যেন কুপোকাত হয়ে গেছেন নারায়ণগঞ্জের কিংমেকার খ্যাত মোহাম্মদ আলী যিনি বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করতেন। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা তাকে উপদেষ্টা হিসেবে মানতেন। তার আশীর্বাদে অনেকেই প্রভাবশালী নেতাও বনেছেন। সেই সাথে অনেকেই তার আশীর্বাদের আশায় থাকতেন। কিন্তু এবার তার কন্ঠে আসা এক ‘জয় বাংলা’ শব্দে অনেক নাজেহাল হতে হয়েছে মোহাম্মদ আলীকে। তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে কখনও এরকম নাজেহাল অবস্থায় পড়তে হয়নি। এবার যতটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে হয়েছে এই মোহাম্মদ আলীকে। এক টিপুর তোড়জোড়ের কারণে মোহম্মদ আলীকে নতি স্বীকার করে ক্ষমাও চাইতে বাধ্য হতে হয়েছে। তারপরেও যেন তিনি সহজেই পার পাচ্ছেন না। টিপু সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যেন পিছু ছাড়ছেন না।
সবশেষ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। গত ২৬ মার্চ দুপুরে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আর এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা হিসেবে মোহম্মদ আলী থাকার কথা থাকলেও তিনি এখানে কোনো অবস্থান নিতে পারেননি। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি অতিথি হিসেবে উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও টিপুর অনুসারীদের তোপের মুখে তাকে অনুষ্ঠানের বাইরে থাকতে হয়েছে। এদিন অনুষ্ঠানের টিপুর অনুসারী সহ বিভিন্ন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আগে থেকেই শিল্পকলা একাডেমী দখলে নেন। চারদিক ঘেরাও করে রাখেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
সেই সাথে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিয়ে নেন অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে টিপু বলেন, শামীম ওসমান সেলিম ওসমান মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। আমরা তাদের দোসদের দ্বারা মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে আর কলুষিত হতে দিতে পারি না। আমরা সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা সংষদ পরিচালিত হোক এটা চাই। আপনারা মুক্তিযোদ্ধারা কারও দ্বারা পরিচালিত হবেন না।
অথচ এর আগের দিন রাতে অনেক বিমর্ষ চেহারায় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন মোহাম্মদ আলী। যে বিমর্ষ চেহারায় আগে কখনও দেখেনি কেউ। সেদিন তিনি ক্ষমা চেয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা একই সাথে আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সংসদ সদস্য ছিলাম। আমার ব্রেইনে সমস্যার কারণে আমি ব্যাংকক গিয়েছিলাম চিকিৎসার কারণে। সেখান থেকে আসার পরই জেলা প্রশাসকের দাওয়াতে আমি সেদিন ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে ভুলবসত আমার মুখ থেকে ‘জয় বাংলা’ বাক্যটি বের হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, আমার সাথে টিপু সাহেবের সাথে কোন শত্রুতা নেই। সে আমার ছোট ভাই, সে যে রাজনীতির আদর্শ মানে আমিও সেই রাজনীতির আদর্শের একজন মানুষ। তবুও যদি সে আমার কথায় বা অন্য যারাই আছেন যদি আমার কথায় ব্যথিত হয়ে থাকেন তাহলে আমি সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। জয় বাংলা বলা আমাদের দীর্ঘ দিনের চর্চা করে রেখেছিলো ফ্যাসিস্ট হাসিনা। আমাদের সব কিছুতেই তিনি বাধ্য করতেন ‘জয় বাংলা’ বলার জন্য। আমি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থে। কিন্তু আমি সব সময় আমার আদর্শে অটল ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থে আমার সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানদের সাথে সক্ষতা বজায় রাখতে হয়েছে। আমিই জোর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের নানা উন্নয়নমূলক কাজগুলো করিয়েছি। কখনো তাদের থেকে কোন রাজনৈতিক ফয়দা হাসিল করার চেষ্টাও করিনি।
তার আগে নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে জেলা পরিষদের উদ্যোগে আর্থিক অনুদানের চেক প্রদান করা হয়। গত ২৪ মার্চ দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেন।
এসময় নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলীও উপস্থিত ছিলেন। সেই সাথে তিনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমাদের মাঝে কোনো বিভেদ নেই। এবার ১৪০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। আমারা আশা করবো আগামীতে এই সংখ্যাটা যেন ১৪০ থেকে ২৪০ করা হয়। আর আমাদের কোনো সমস্যা নেই। যে কোনো সমস্যায় আপনারা জেলা প্রশাসকের কাছে আসবেন। উনি অনেক আন্তরিক। এরপর তিনি ‘জয়বাংলা’ বলে বক্তব্য শেষ করেন।
তার এই জয়বাংলার পরপরই নারায়ণগঞ্জে নানা মহলের শুরু হয়েছে আলোচনা সমালোচনা। সেই সাথে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন।
তারই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের তিরস্কারমূল স্লোগান দেয়া হয়।
এসময় রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমেদ, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও নারায়ণগঞ্জ জেলা গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারি তরিকুল সুজন।
পরবর্তীতে তারা সকলেই জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাথে সাক্ষাৎ করেন। আর সেই সাক্ষাতে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করা হয় মোহাম্মদ আলীকে যেন পরবর্তী পোগ্রামে দাওয়াত দেয়া না হয়। সেই সাথে তাদের অনুরোধের প্রক্ষিতে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়েছেন তাকে আর দাওয়াত দেয়া হবে না।
‘মোহাম্মদ আলীকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর’ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসককে আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, সে (মোহাম্মদ আলী) জয় বাংলা ¯েøাগান দিয়ে বিশৃঙ্খলা করতে চায়। তাকে কোনো প্রোগ্রামে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেন দাওয়াত দেওয়া না হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আমাদের সম্মান আছে। কিন্তু উনি সবসময় দালালি করে। গত ১৬ বছর ধরে দালালি করছে। সাধারণ জনগণের পক্ষে কখনও কাজ করে নাই। এখন আবার নতুন করে সে বিশৃঙ্খলা করতে চাচ্ছে।
বিএনপির এ নেতা আরও বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ আমলে যারা গডফাদার ছিল, সেই শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান, আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমানের সাথে তার (মোহাম্মদ আলী) যোগাযোগ আছে। সে স্লোগান দিয়ে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করছে। তাকে যেন কোনো প্রোগ্রামে না ডাকা হয়। তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হোক।
জনশ্রুতি রয়েছে- সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ, অরাজনৈতিক শ্রমিক সংগঠন, এমন কি এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্লাব, সমিতির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনেও প্রার্থীদের জন্য মোহাম্মদ আলী আর্শিবাদ হিসেবে কাজ করে থাকেন। তার আর্শিবাদ পেলে যে কোন প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনে জয়ী হওয়া সহজ হয়ে যেত।
মোহাম্মদ আলী শুরু থেকেই নিজেকে নেতা বানানোর কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর তাই নারয়াণগঞ্জের রাজনীতিতে সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যোগ্য অভিভাবক হিসেবে ভরসার আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করেছেন মোহাম্মদ আলী। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের মুরুব্বী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের অপকর্মের দায়ভার তার উপড় বর্তালেও মোহাম্মদ আলী বেশ ভালো অবস্থানেই ছিলেন।
কিন্তু এবার মোহাম্মদ আলীর কণ্ঠে জয়বাংলা যেন বেশ বিপাকে ফেলে দিয়েছে তাকে। সেই সাথে তিনি এই বিপদ কবে নাগাদ কাটিয়ে উঠতে পারবেন সেটা পরিলক্ষিত বিষয়।
আপনার মতামত লিখুন :